DR. AMINUL ISLAM

Published:
2026-01-13 18:56:38 BdST

কবি-কথাসাহিত্যিকগণও এক ধরনের বিজ্ঞানী



অধ্যাপক ডা মোহিত কামাল


---------------

ইমাজিনেশন বলতে আমরা কী বুঝি?
মনস্তাত্ত্বিকভাবে কল্পনাপ্রতিভা বা ভাবনাতত্ত্ব ইমাজিনেশনের গুরুত্বপূর্ণ অনুষদ; সৃজনশীলতার সঙ্গে যুক্ত হয়ে সৃষ্টিশীল জগৎ আলোকিত করে। তাই কাব্যসাহিত্য সৃজনে কেবল কল্পনা নয়, প্রবলভাবে অন্তঃস্রোত তৈরি করে creative imagination বা সৃষ্টিশীল কল্পনাশক্তি। এসবই মেধার মূল বিষয়। এর সঙ্গে আরও যুক্ত আছে মেমোরি বা স্মরণশক্তি, অর্থপূর্ণ উপলব্ধির দক্ষতা, যুক্তি আরোপের ক্ষমতা, সমস্যা সমাধান ও সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা। কথাসাহিত্য নির্মাণে এসবের ভূমিকা থাকলেও কাব্যসত্তার স্বতঃস্ফূর্ত উদ্‌দ্গিরণের জন্য লুকানো প্রধান শক্তি হিসেবে কাজ করে সৃষ্টিশীল কল্পনাপ্রতিভা।

দেহের সংবেদনশীল পঞ্চ ইন্দ্রিয় বা মনের পাঁচটি জানালা দিয়ে নানা তথ্য ঢোকে মস্তিষ্কে। তা মানুষের অভিজ্ঞতাকে সমৃদ্ধ করে এবং সচেতন ভাবনাজগৎ বা কগনিটিভ ওয়ার্ল্ড কিংবা কনশাস ঘটস আলোড়িত করে, আবেগে পরিবর্তন ঘটায়। আচরণেও। আবার ইন্দ্রিয়-মাধ্যম ছাড়াও অনুভব করা যায়, ঠিক দেখাশোনার মতো সরাসরি মনের একই রকম অনুভূতি, উপলব্ধি-এটাই সৃষ্টিশীল কল্পনাশক্তি বা ক্রিয়েটিভ ইমাজিনেশন।
কেবল ইংরেজিতে নয়, বাংলাতেও ক্রিয়েটিভ শব্দটি বেশ প্রচলিত। আমরা জানি 'ক্রিয়েট' থেকে এসেছে 'ক্রিয়েটিভ'। এই পদটির মানে হচ্ছে মৌলিক কিছু সৃষ্টি করা, মৌলিক সত্যের উন্মোচন করা, মৌলিক পথ নির্মাণ করে সামনের জটিল পথ সহজ করা।

'সাহিত্য হলো জীবন ও জগতের অনুকরণ বা imitation'-প্লেটোর এই *মাইমেটিক থিওরি কিংবা ক্লাসিকাল ও নিউক্লাসিক্যাল মতবাদকে ধাক্কা দিয়ে রোমান্টিক যুগের কবিগণ জোরালোভাবে ঘোষণা করলেন, 'সাহিত্যের কাজ হলো সৃজন, অনুকরণ নয়'।
তাঁরা আরও বলেছেন, 'কবিতার প্রকৃত স্রষ্টা কবিকল্পনা-এটি ফ্যান্টাসি নয়, কল্পনাশক্তি। এই শক্তির সঙ্গে স্মৃতি, অভিজ্ঞতা বা পুনর্গঠন ক্রিয়ার কোনও সম্পর্ক নেই।' অর্থাৎ স্মৃতি বা অভিজ্ঞতার পুনঃবয়ান ছাড়া আচমকা মাথায় বা মনে একটা আইডিয়া বা ধারণা উড়ে আসার নাম কবিকল্পনা। এই কল্পনাই সৃজনশীল প্রক্রিয়া বা সৃজনশীল কল্পনা।

রোমান্টিক যুগের কবিদের মধ্যে ওয়ার্ডসওয়ার্থ তাঁর অসামান্য কল্পনাশক্তি ব্যবহার করে প্রকৃতির মধ্য থেকে অনন্য জ্যোতি ছড়িয়ে দিলেন-কখনও ওয়াই নদীর তীর, ড্যাফোডিল ফুল নিয়ে সৃষ্টি করলেন কালজয়ী সব কবিতা। নাইটিংগেলের গান কিংবা শরৎ-প্রকৃতির সুষমা নিয়ে কিটস রচনা করলেন ঘোরমন্ত্র অনন্য জগৎ। ওয়েস্ট উইন্ডের বিপুল শক্তির কালজয়ী আলো ছড়িয়ে দিলেন শেলি। তবে তাঁরা কি সর্বতোভাবে সফল হয়েছেন? সমালোচনার ঊর্ধ্বে উঠতে পেরেছেন? নিউ ক্রিটিজম বলছে, "তাঁদের মধ্যে পলায়নপরতা ছিল (cscapism)। বাস্তবের কঠিন রূঢ়তা-দুঃখ-কষ্ট-যাতনার সঙ্গে লড়াই করতে না-পেরে কাল্পনিক জগতে পালিয়ে বাঁচার চেষ্টা করে সাময়িক শান্তি লাভের আশায় মারাত্মকভাবে 'আমি'ময় হয়ে গিয়েছিলেন রোমান্টিক যুগের কবিগণ। 'আমার জগৎ',
'আমার শান্তি' নিয়ে ডুবেছিলেন।"

আর রোমান্টিক যুগের কবিদের কিছু দাবি মেনে নিয়েও রবীন্দ্রনাথ কয়েকটি ক্ষেত্রে দ্বিমত পোষণ করে বলেছেন, 'প্রতিটি মানুষেরই রয়েছে কল্পনাশক্তি। যে-শক্তির দ্বারা বিশ্বের সঙ্গে আমাদের মিলনটা কেবলমাত্র ইন্দ্রিয়ের মিলন না-হয়ে মনের হয়ে ওঠে, সে-শক্তি হচ্ছে কল্পনাশক্তি।'

পাশ্চাত্য সাহিত্যতত্ত্বের আরেক গুরুত্বপূর্ণ পণ্ডিত ইতালির লঙ্গিনাসের sublime থিওরি মতে, 'রচনার উৎকর্ষ হচ্ছে এক মহৎ মনের প্রতিধ্বনি'। এখানে লক্ষ্যণীয় বিষয় হচ্ছে 'মন'। এর পাঁচটি উৎসের কথা ব্যাখ্যা করেছেন তিনি-এগুলোর মধ্যে প্রথম হলো মহৎ ধারণা সৃষ্টির সামর্থ্য। দ্বিতীয়: শক্তিশালী ও অনুপ্রেরণাময় আবেগের উদ্দীপনা। তৃতীয় চিন্তা ও বক্তব্য। চতুর্থ দ্বিবিধ অলঙ্কার গঠনের কৃতিত্ব এবং সেই সঙ্গে মহৎ মননের সৃষ্টি-যাকে যথাযথ শব্দচয়ন, কল্পনাপ্রসূত শব্দালঙ্কারের ব্যবহার এবং বৈশিষ্ট্যের প্রকাশ বলা যায়। পঞ্চম: ভাবোন্নয়নের সামগ্রিক দক্ষতা। এসব উৎসের সঙ্গে মনের স্বাস্থ্যের গুরুত্বপূর্ণ অনুষদ আবেগানুভূতিও জড়িত। তবে স্বর্গীয় ভাবানুভূতি সৃষ্টিই sublime হিসেবে বিবেচিত হয়।
এখানেও বিতর্ক আছে। সাহিত্য কেবল স্বর্গীয় অনুভূতি সৃষ্টি করে না, নেতিবাচক যন্ত্রণাবিদ্ধ কষ্টকর অনুভূতি,
হিংসা-বিদ্বেষ, ক্রোধ, ঘৃণা, দ্বন্দ্ব-সংকট, লোভ-লালসার কথাও বলে। কেবল মহৎ আবেগ সৃষ্টি হলে পূর্ণাঙ্গ জীবনের চিত্রকল্প প্রতিফলিত হয় না। তবে বলা যায়, ভালো-খারাপের ভেতর থেকে উন্নত-স্বর্গীয় জীবনবোধ তৈরি হয়, হতে পারে। তাই স্মৃতি বা অভিজ্ঞতানির্ভরতা কিংবা অলৌকিক কবিকল্পনা ইত্যাদি বিতর্কের যে-কোনও বিষয় বিশ্লেষণ করে বলা যায়, এই কল্পনা হচ্ছে মনেরই শক্তি, মনেরই উপাদান, মনেরই বিপুল বিস্ফোরণ, বিস্ফোরিত শক্তির বিকিরণ-এসব নিয়েই সৃজন করেন কবিগণ।
এজন্য কবি-কথাসাহিত্যিকগণও এক ধরনের বিজ্ঞানী।

সহায়কগ্রন্থ:
১. সাহিত্যতত্ত্ব একটি সংক্ষিপ্ত পরিক্রমাঃ মুহম্মদ মুহসিন (ঐতিহ্য)
২. পাশ্চাত্য সাহিত্যতত্ত্ব: বদিউর রহমান (ঐতিহ্য)
৩. কবিতার চিত্রকল্প। সরকার আমিন (পাঠক সমাবেশ)
৪. সাহিত্যতত্ত্ব: প্রাচ্য ও পাশ্চাত্য। হীরেন চট্টোপাধ্যায় (দে'জ পাবলিশিং)
৫. বিদ্রোহী কবিতার মনস্তত্ব: মোহিত কামাল (স্বপ্ন '৭১)

আপনার মতামত দিন:


কলাম এর জনপ্রিয়