DESK

Published:
2026-09-26 20:51:22 BdST

PMOS রোগীদের ৪০% ডিপ্রেশন এ্যাংজাইটিতে ভোগে


 

অধ্যাপক ডা. সুলতানা আলগিন


মনোরোগ বিদ্যার শিক্ষক 
ওসিডি ও জেরিয়াট্রিক মানসিক স্বাস্থ্য পরামর্শক

___________________________

প্রজননক্ষম নারীদের মধ্যে বয়সন্ধিকাল থেকে মেনোপজ পর্যন্ত PMOS (পলিএন্ডোক্রাইন মেটাবলিক ওভারিয়ান সিন্ড্রোম) এর আশংকা বেড়ে চলেছে। আগে PCOS(পলিসিস্টিক ওভারী সিন্ড্রোম) নামে পরিচিত ছিল। যদিও হরমোনাল পরিবর্তন এর মূল কারণ কিন্তু এই রোগের কারণে কৈশোর কাল থেকে আরম্ভ করে মেনোপজের পরেও নারীকে মানসিক, শারীরিক ও সামাজিকভাবে বঞ্চনার বলি হতে হয়।
PMOS রোগীদের ৪০% মানসিক রোগ ডিপ্রেশন এ্যাংজাইটি রোগে ভোগে।এছাড়াও বাইপোলার মুড ডিসঅর্ডার, ওসিডি,ইনসোমনিয়া, ওবেসিটি ,ইটিং ডিসঅর্ডার, পার্সোনালিটি ডিসঅর্ডার,সোমাটিক সিম্পটম ডিসঅর্ডার ইত্যাদি রোগে ভোগে। PMOS রোগীদের সাধারণের তুলনায় মানসিক রোগ হওয়ার আশংকা তিনগুণ বেশী।

কারণ কি?
PMOS মূলত HPA axis এর ত্রুটিপূর্ণ(হাইপারএকটিভিটি) কাজের জন্য দায়ী। মেয়েদের শরীরে এন্ড্রোজেন নিঃসরণের কারণে হরমোনাল লেভেলে পরিবর্তন দেখা যায়। এন্ড্রোজেন (টেস্টোসটেরন) লেভেল বেড়ে যায়। শারীরিক পরিবর্তন দেখা যায় যেমন মুখে গলায় শরীরে বিভিন্ন জায়গায় রোম বেড়ে যায়। অথচ মাথার চুল কমে যায়। গলায় ঘাড়ে কালো দাগ দেখা দেয়।ওজন বেড়ে যায়। মাসিকের অনিয়ম, বন্ধ্যাত্ব হয়।ইনসুলিনের কর্মক্ষমতা কমে যায়। ডায়াবেটিস হাইপারটেনশন হৃদরোগ যকৃতে রোগ বাসা বাধে। ক্রনিক প্রদাহ শরীরে রাসায়নিক পরিবর্তন ঘটায়।
খাদ্য গ্রহণ ও মেটাবোলিজমে সমস্যা দেখা দেয়।ইনসুলিন রেজিস্ট্যান্স দেখা দেয়। ওবেসিটি   হাইপারটেনশন দেখা যায়। ইটিং ডিসঅর্ডার ( বিনজ ইটিং, বুলিমিয়া নারভোসা,এনোরেক্সিয়া নারভোসা),সোমাটিক সিম্পটম ডিসঅর্ডার ইত্যাদি মানসিকরোগে আক্রান্ত হতে পারে।
এন্ড্রোজেনের কারণে সিরোটনার্জিক সিস্টেমের কার্যক্রম ব্যাহত হয়। ফলে সিরোটনিন ডোপামিন তৈরী কমে যায়। এই সিরোটনিন মানুষের ঘুম ,ক্ষুধা, মনমেজাজ ,ইম্পালসিভিটি নিয়ন্ত্রণ করে। আর এই নিউরোট্রান্সমিটারের ঘাটতির কারণে মানসিকরোগসমূহের আশংকা বেড়ে যায়। নিজেকে আঘাত করার প্রবণতা,আত্মহত্যার মত দুর্ঘটনার আশংকা বেড়ে যায়।

কাদের হওয়ার আশংকা থাকে?
১.কিশোর বয়স(বয়:সন্ধি-১৯ বছর),ইয়াং এডাল্ট(২০-৩০ বছর) এবং পূর্ণ বয়স্ক ও মেনোপজ( ৪০ বছর এবং উপরে) পর্যন্ত এর প্রতিক্রিয়া বয়ে বেড়ায়।স্বাভাবিকের তুলনায় PMOS রোগীদের মেনোপজ ২-৩ বছর দেরীতে হয়। প্রথম মাসিকের পরে অনেকের অনিয়মিত মাসিক দেখা যায় ।২-৩বছর পর্যন্ত মাসিক বন্ধ থাকতে পারে।এসময় মাল্টি ফলিকুলার ওভারি থাকাটা স্বাভাবিক। পূর্ণ ডিম তৈরী নাও হতে পারে। তাই টিনএজে পেলভিক আল্ট্রাসনোগ্রাম না করাই শ্রেয়।
২.প্রথম মাসিক শুরুর পর থেকেই এই রোগ শুরু হতে পারে। ইয়াং এডাল্ট(২০-৩০ বছর) বয়সীরা যখন বাচ্চা নেয়ার চেস্টা করে বিফল হয় তখনই এর ডায়াগনসিস করার উপযুক্ত সময়।
৩.পূর্ণ বয়স্ক ও মেনোপজ( ৪০ বছর এবং উপরে) এর পরেও এর মেটাবোলিক ডিসঅর্ডার যেমন টাইপ-২ ডায়াবেটিস,উচ্চ রক্তচাপ,হৃদরোগ ইত্যাদি রোগের চিকিৎসা চালিয়ে যেতে হয়।
৪.ওবেসিটি এবং ইনসুলিন রেজিস্ট্যান্স এই রোগ হওয়ার ক্ষেত্রে একটা ভূমিকা রাখে।
৫.বংশগত কারণে এই রোগটি হতে পারে। যাদের পরিবারে টাইপ-২ ডায়াবেটিস থাকে তার এই রোগ হওয়ার আশংকা থাকে। এমনকি গর্ভে থাকা অবস্থায় অতিরিক্ত এন্ড্রোজেন থাকলে,প্রিমেচ্যুর বা ওভারওয়েট শিশুদের এই রোগ হওয়ার আশংকা থাকে।

কখন PMOS বলা যাবে?
Rotterdam criteria অনুযায়ী তিনটি ক্রাইটেরিয়ার কমপক্ষে দুইটি থাকতে হবে।
১.অনিয়মিত মাসিক,
২.অতিরিক্ত এন্ড্রোজেন,
৩.পলিসিস্টিক ওভারী(আল্ট্রাসনোগ্রামে পাওয়া)
***অনুমানের ভিত্তিতে নয়, ডায়াগনসিস নিশ্চিত করেই প্রেসক্রিপশনে PMOS লেখা উচিত।

মানসিক চাপের কারণ :
বর্তমান সমাজ ব্যবস্থায় আধুনিক গ্যাজেট মোবাইল সবার নাগালে ।তাই কোন রোগ সম্পর্কে বিস্তারিত জানার সুযোগ এখন কোন ব্যাপার না। রোগী অনেক সময় রোগ সম্পর্কে বিস্তারিত জেনে আসে।
একজন কিশোরী এসময় তার শারীরিক পরিবর্তনগুলো নিয়ে এমনিতেই বিমর্ষ থাকে। প্রতি বার মাসিকের সময় প্রচন্ড ব্যাথা,অনিয়ম মেয়েটিকে আতঙ্কগ্রস্ত করে তোলে। মনে হয় মেয়ে না হয়ে ছেলে হলে ভালো হতো। মুখে গলায় শরীরে বিভিন্ন জায়গায় রোম বেড়ে যায়। অথচ মাথার চুল কমে যায়। গলায় ঘাড়ে কালো দাগ দেখা দেয়।ওজন বেড়ে যায়।নিজের চেহারা অবয়ব নিয়ে নিয়ে অস্বস্তি বোধ করে। নিজেকে আড়াল করে রাখতে চায়। বডি সেইমিং, বিভিন্ন সময় পিয়ার গ্রুপদের বুলিং এর শিকার হতে হয়। “বন্ধ্যাত্ব” শব্দটি এদের মনের মধ্যে ধারালো ভাবে গেঁথে যায়। পারিবারিকভাবে সামাজিকভাবে হেনস্তা হতে দেখা যায়। বিষন্নতা উদ্বিগ্নতা দেখা যায়। ঘুমের সমস্যা(ইনসোমনিয়া, স্লিপ এপনিয়া) দেখা দেয়। সারারাত জেগে ভোরে ঘুমাতে যায়।মোবাইল নিয়ে জেগে থাকে। রিলেশনসীপ প্রবলেম মারাত্মক আকার ধারণ করে। হীনমন্যতা পেয়ে বসে। রাত জেগে বিভিন্ন খাবারের ক্র্যাভিং হয়। ওজন বাড়ে। ডায়াবেটিস হওয়ার আশংকা বাড়ে। ইটিং ডিসঅর্ডার ( বিনজ ইটিং, বুলিমিয়া নারভোসা,এনোরেক্সিয়া নারভোসা), মুড সুইং, ওসিডি রোগ ইত্যাদি মানসিকরোগে আক্রান্ত হওয়ার সম্ভবনা বেড়ে যায়। সাধারণের তুলনায় আত্মহত্যার প্রবণতা ৮.৪৭ গুণ বেশী দেখা যায় ।আত্মহত্যার প্রবণতা সাধারণের তুলনায় কিশোরীদের মাঝে ৫.৩৮গুণ, চল্লিশের নীচে পূণ বয়স্কদের মাঝে ৯.১৫গুণ আর তার থেকে বেশী বয়স্কদের মাঝে ৩.৭৫গুণ বেশী ।

করণীয়:
সঠিকভাবে ডায়াগনসিস না হওয়া পর্যন্ত নিজেকে PMOS এর রোগী ভেবে মনোকষ্টে ভোগা বুদ্ধিমানের কাজ না।মাসিকে অনিয়মিত সমস্যা থাকলে মানসিক ভাবে দুর্বল হওয়ার কারণ নেই। যথাযথ খাবার, নিয়মিত ব্যায়াম পর্যাপ্ত ঘুম একজনের মানসিক অবসাদ কাটাতে অনেকখানি সাহায্য করে।ফাস্ট ফুড বাদ দিয়ে ফাইবার, প্রোটিন সমৃদ্ধ খাবার খেতে হবে। সিরোটনিন বাড়ায় এমন সব খাবার ডায়েটে রাখতে হবে । ওজন নিয়ন্ত্রণে রাখা জরুরী। শারীরিক চিকিৎসার পাশাপাশি মানসিকরোগে বা সমস্যায় ভুগলে অবশ্যই মানসিকরোগ বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নিতে হবে। সামাজিক কুসংস্কার থেকে বের হয়ে আসতে হবে। সঠিক চিকিৎসা আপনাকে দেবে সুস্থ জীবন। পরিবারের সমাজের সহযোগিতা এবং পজিটিভ মনোভাব এবাঁধা কাটিয়ে সবার মাঝে নতুন জাগরণের সঞ্চার করবে এই প্রত্যাশা।

#

 


মন জানে এর জনপ্রিয়